এক ক্লিকেই সর্বনাশ! সাইবার অপরাধীদের নিশানায় সাধারণ মানুষ
প্রকাশিত: জুন ২১, ২০২৬, ০৮:২৪ সকাল
ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে সাইবার প্রতারণা ও আর্থিক জালিয়াতি। অনলাইনে সস্তায় ডলার কেনাবেচা, ফেসবুক-ইউটিউব মনিটাইজেশন, সাবস্ক্রাইবার বৃদ্ধি কিংবা ডিজিটাল ওয়ালেট ব্যবহারের প্রলোভন দেখিয়ে প্রতিদিন প্রতারণার শিকার হচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। সংঘবদ্ধ সাইবার চক্র অভিনব কৌশলে ক্রেডিট কার্ড, মোবাইল ব্যাংকিং ও অনলাইন অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা।
সম্প্রতি মিঠু নামে এক বাংলাদেশি যুবক অনলাইনে পরিচিত এক প্রবাসী বাঙালির কাছে নিজের ক্রেডিট কার্ডের তথ্য শেয়ার করেন। অভিযোগ রয়েছে, ওই তথ্য ব্যবহার করে মুহূর্তের মধ্যেই তার অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় ৮০ হাজার টাকা তুলে নেওয়া হয়।
অন্যদিকে, ইউটিউব মনিটাইজেশন ও ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের সুবিধা পাওয়ার আশায় এক চাকরিজীবী প্রতারকদের ফাঁদে পড়ে বিকাশ অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ হারান। পরে তার অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় ৫০ হাজার টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্থিক তথ্য ফাঁস হলে শুধু অর্থ নয়, একজন ব্যক্তির পুরো ডিজিটাল পরিচয়ই ঝুঁকির মুখে পড়ে। হ্যাকাররা এসব তথ্য ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ই-মেইল, ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট দখল করতে পারে। এমনকি ভুক্তভোগীর পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার আশঙ্কাও থাকে।
সস্তা ডলারের লোভে প্রতারণা
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন ওয়েবসাইটে অনলাইন ডলার কেনাবেচার নামে ব্যাপক প্রতারণা চলছে। প্রতারকরা ‘পেপাল’, ‘স্ক্রিল’, ‘নেটেলার’ বা অন্যান্য ডিজিটাল ওয়ালেটের জন্য বাজারদরের চেয়ে কম মূল্যে ডলার দেওয়ার প্রলোভন দেখায়।
“মাত্র ৭৪ টাকায় ডলার কিনুন” কিংবা “কম রেটে ডলার এক্সচেঞ্জ” ধরনের বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে অনেকে বিকাশ বা অন্য মোবাইল ব্যাংকিং মাধ্যমে টাকা পাঠান। টাকা পাঠানোর পরই বন্ধ হয়ে যায় যোগাযোগের সব মাধ্যম।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, অনুমোদিত ব্যাংক ও বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় প্রতিষ্ঠান ছাড়া অনলাইনে ডলার কেনাবেচা সম্পূর্ণ অবৈধ।
মনিটাইজেশন ও সাবস্ক্রাইবার বাড়ানোর নামে নতুন প্রতারণা
ফেসবুক ও ইউটিউব মনিটাইজেশন সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নামে সম্প্রতি নতুন ধরনের প্রতারণা বেড়েছে। প্রতারকরা দাবি করে নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে দ্রুত মনিটাইজেশন চালু, ফলোয়ার বৃদ্ধি কিংবা সাবস্ক্রাইবার বাড়িয়ে দেওয়া হবে।
রাজু হাসান নামে এক ভুক্তভোগী জানান, ফেসবুকের একটি বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তিনি একটি অনলাইন ফর্ম পূরণ করেন। পরে তার মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা কেটে নেওয়া হয়। এরপর তিনি বুঝতে পারেন, প্রতারকরা তার ব্যক্তিগত আর্থিক তথ্য সংগ্রহ করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব প্রতারণার মাধ্যমে শুধু অর্থ নয়, ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্যও সংগ্রহ করা হয়। পরে সেই তথ্য ব্যবহার করে অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং, পরিচয় চুরি ও আর্থিক জালিয়াতি সংঘটিত হয়।
ভুয়া এনআইডি ও নথির অবৈধ বাজার
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), টিন সার্টিফিকেট, ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও অন্যান্য নথি তৈরির অবৈধ বাজারের তথ্য।
মাত্র কয়েকশ টাকার বিনিময়ে এসব জাল নথি সরবরাহ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব নথি ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে, ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্ম এবং বিভিন্ন আর্থিক সেবায় ভুয়া অ্যাকাউন্ট খোলা হচ্ছে। পরে সেগুলো অর্থ পাচার, প্রতারণা ও অন্যান্য সাইবার অপরাধে ব্যবহৃত হচ্ছে।
তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী মেহরাজ হোসেন রবিন বলেন, আধুনিক গ্রাফিক্স সফটওয়্যার ব্যবহার করে তৈরি এসব জাল নথি সাধারণ মানুষের পক্ষে শনাক্ত করা কঠিন। ফলে প্রতারণার ঝুঁকি আরও বেড়ে যাচ্ছে।
বাড়ছে ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি
দেশে ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ডের ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে কার্ড তথ্য চুরি ও জালিয়াতির ঘটনাও।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির বলেন, ব্যক্তিগত তথ্য, পাসওয়ার্ড বা অ্যাকাউন্ট রিকভারি তথ্য ফাঁস হলে হ্যাকাররা সহজেই অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে। এমনকি ভুক্তভোগীর পরিচয় ব্যবহার করে নতুন আর্থিক সেবা গ্রহণ বা জালিয়াতির ঘটনাও ঘটতে পারে।
টেকনো হেভেন কোম্পানি লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও হাবিবুল্লাহ এন করিম বলেন, ডিজিটাল পরিচয় চুরি বর্তমানে অন্যতম বড় সাইবার হুমকিতে পরিণত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে ব্যাংকিং অ্যাপ পর্যন্ত সব ধরনের অ্যাকাউন্টই এর ঝুঁকিতে রয়েছে।
যেভাবে নিরাপদ থাকবেন
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী—
• OTP, PIN, CVV বা পাসওয়ার্ড কখনো কারও সঙ্গে শেয়ার করবেন না।
• অচেনা লিংক বা সন্দেহজনক ফোনকল এড়িয়ে চলুন।
• নিয়মিত ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও লেনদেন পর্যবেক্ষণ করুন।
• পাবলিক ওয়াই-ফাই ব্যবহার করে আর্থিক লেনদেন করবেন না।
• শক্তিশালী ও ইউনিক পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন।
• টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন (2FA) চালু রাখুন।
• শুধুমাত্র অফিসিয়াল অ্যাপ স্টোর থেকে অ্যাপ ডাউনলোড করুন।
• প্রয়োজন না হলে কার্ড লক বা সীমিত ব্যবহার নিশ্চিত করুন।
• সন্দেহজনক লেনদেন দেখা গেলে দ্রুত ব্যাংক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানান।
সাইবার অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, ডিজিটাল অর্থনীতির এই সময়ে ব্যক্তিগত তথ্যই সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। তাই অনলাইনে যেকোনো আর্থিক লেনদেনের আগে সচেতনতা ও সতর্কতাই হতে পারে সাইবার প্রতারণা থেকে বাঁচার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
