ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩

দ্রুত ভাঙনের পেছনে তিন কারণ

ভোটে পরাজয়ের পর ২৮ দিনের মধ্যেই তিন টুকরো তৃণমূল!

নিউজ ডেস্ক

 প্রকাশিত: জুন ২০, ২০২৬, ০২:২২ দুপুর  

মমতা ব্যানার্জী। সংগৃহীত ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদন:
একটানা প্রায় দেড় দশক পশ্চিমবঙ্গ শাসনের পর নির্বাচনে পরাজয়ের মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই কার্যত তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। রাজনৈতিক মহলে এই ঘটনাকে অনেকেই দলটির অভ্যন্তরীণ ‘ইমপ্লোশন’ বা ভেতর থেকে ভেঙে পড়ার উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।

একদিকে সদ্য নির্বাচিত একদল বিধায়ক ঋতব্রত ব্যানার্জীর নেতৃত্বে আলাদা গোষ্ঠী গড়ে নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ বলে দাবি করছে। অন্যদিকে, লোকসভার একাংশের সাংসদ নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে যোগ দিয়ে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএকে সমর্থনের ঘোষণা দিয়েছেন। এদিকে মমতা ব্যানার্জী ও অভিষেক ব্যানার্জীকে ঘিরে থাকা মূল অংশটি এখন রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে ব্যস্ত।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এত দ্রুত ভাঙনের পেছনে মূলত তিনটি কারণ কাজ করেছে।

১. নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনীতির সীমাবদ্ধতা

তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনীতির মূল লক্ষ্য দীর্ঘদিন ধরে ছিল নির্বাচনে জয় এবং ক্ষমতায় থাকা। সমালোচকদের মতে, দলটির সুস্পষ্ট আদর্শিক ভিত্তি বা সাংগঠনিক দর্শন তুলনামূলক দুর্বল ছিল।

ফলে টানা তিনবার ক্ষমতায় থাকার পর চতুর্থবার পরাজয় আসতেই বহু নেতা মনে করতে শুরু করেন যে দলটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। বিজেপি, কংগ্রেস কিংবা বাম দলগুলোর মতো আদর্শিক ভিত্তি বা বৃহত্তর সাংগঠনিক কাঠামো না থাকায় ভোটে হারের পর তৃণমূলের অনেক নেতাই নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন হিসাব-নিকাশ শুরু করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, ‘মা-মাটি-মানুষ’ বা বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্প রাজনৈতিক সুবিধা দিলেও তা দীর্ঘমেয়াদে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার জন্য যথেষ্ট ছিল না।

২. ভাঙনের অনুঘটক হিসেবে বিজেপি

নির্বাচনে পরাজয়ের পর মমতা ব্যানার্জীর দুর্বল অবস্থাকে কাজে লাগিয়ে বিজেপি পরিস্থিতির রাজনৈতিক সুবিধা নিতে চেয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

তাদের মতে, রাজ্যে একটি তুলনামূলক ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ বিরোধী শক্তি তৈরি করা এবং কেন্দ্রে এনডিএর শক্তি বাড়ানোর লক্ষ্য থেকেই তৃণমূলের বিদ্রোহী অংশগুলিকে পরোক্ষ সমর্থন দেওয়া হয়েছে।

যদিও বিদ্রোহী বিধায়ক বা সাংসদদের সরাসরি বিজেপিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, তবুও তাদের নতুন অবস্থান বিজেপির জন্য রাজনৈতিকভাবে লাভজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে বলে বিশ্লেষকদের একাংশের মত।

৩. অভিষেক ব্যানার্জীকে ঘিরে অসন্তোষ

তৃণমূলের বিদ্রোহী নেতাদের বড় অংশের অভিযোগ, দলের মধ্যে কেন্দ্রীভূত নেতৃত্ব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অভিষেক ব্যানার্জীর প্রভাব ক্রমশ বেড়ে যাওয়ায় পুরনো নেতাদের সঙ্গে শীর্ষ নেতৃত্বের দূরত্ব তৈরি হয়।

দলের কৌশল নির্ধারণে পেশাদার সংস্থার ভূমিকা, কর্পোরেট ধাঁচের সংগঠন পরিচালনা এবং একটি সীমিত গোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অভিযোগও সামনে এসেছে।

এছাড়া অভিষেক ব্যানার্জীর বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ—যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তদন্ত বা বিচারাধীন—তার ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ফলে দলত্যাগী নেতারা নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে অভিষেক ব্যানার্জীকেই প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরছেন।

 

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পর নির্বাচনে পরাজয়, আদর্শিক দুর্বলতা, বিজেপির কৌশলগত ভূমিকা এবং নেতৃত্বের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব—এই তিনটি উপাদানের সম্মিলিত প্রভাবেই তৃণমূল কংগ্রেসের দ্রুত ভাঙন ঘটেছে।

তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই ঘটনাপ্রবাহ একটি কাল্পনিক বা বিশ্লেষণভিত্তিক পরিস্থিতি হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। বাস্তবে ২০২৬ সাল পর্যন্ত মমতা ব্যানার্জীর নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস আনুষ্ঠানিকভাবে তিন ভাগে বিভক্ত হয়নি।