বাজেটে জনকল্যাণের প্রতিফলন নেই, দাবি জামায়াতে ইসলামীর
প্রকাশিত: জুন ১২, ২০২৬, ০৪:৫৪ দুপুর
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছে জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। দলটির দাবি, ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এ বাজেট অতিমাত্রায় ঋণনির্ভর, বাস্তবতাবিবর্জিত এবং দুর্নীতি ও অপচয়ের ঝুঁকিপূর্ণ। তাদের ভাষায়, এটি একটি ‘উচ্চাভিলাষী ও লুটপাটনির্ভর বাজেট’, যা জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হবে।
শুক্রবার (১২ জুন) রাজধানীর মগবাজারে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাজেট বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া তুলে ধরেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট মূলত ব্যাংক ঋণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীল। বাজেটে ৬ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও সেই রাজস্ব কীভাবে আদায় করা হবে, তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। একইভাবে ২ লাখ ৩৬ হাজার ২৫০ কোটি টাকার বাজেট ঘাটতি কীভাবে পূরণ করা হবে, সেটিও পরিষ্কার নয়।
গোলাম পরওয়ারের মতে, বাজেট বাস্তবায়নে কর কাঠামোর সংস্কার, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি।
তিনি বলেন, বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যাংক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সরকার ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়নের সুযোগ সংকুচিত হবে।
বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। প্রথমত, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ক্রমবর্ধমান ব্যয়। দ্বিতীয়ত, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি। তৃতীয়ত, বৈশ্বিক ও রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। তাঁর মতে, এসব কারণে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অর্জন এবং বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে।
জামায়াতের ছায়া বাজেটের সঙ্গে সরকারের বাজেটের তুলনা করে তিনি বলেন, জনগণ একটি জনবান্ধব, সুপরিকল্পিত ও বাস্তবসম্মত বাজেট প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু ঘোষিত বাজেটে জনগণের জীবনমান উন্নয়ন এবং তাদের প্রত্যাশার প্রতিফলন স্পষ্ট নয়।
তিনি আরও বলেন, কর প্রশাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা ব্যবস্থার কার্যকর সংস্কারের কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা বাজেটে দেখা যায়নি। ফলে বিপুল অঙ্কের এই বাজেট বাস্তবায়নের সময় দুর্নীতি, অপচয় ও অনিয়মের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে প্রশ্ন তুলে গোলাম পরওয়ার বলেন, বাজেটে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান বিনিয়োগ পরিস্থিতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, দুর্নীতি এবং উৎপাদনশীলতা-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় এ লক্ষ্য অর্জন কঠিন হতে পারে।
তিনি উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা আগামী অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। সে তুলনায় সরকারের লক্ষ্যমাত্রা অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী বলে তিনি মন্তব্য করেন। একইভাবে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রাকেও তিনি বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন।
এডিপির আকার ৩ লাখ কোটি টাকায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর মতে, পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করে উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানো হলে দুর্নীতি ও অপচয়ের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের প্রস্তাবিত ছায়া বাজেটের বিভিন্ন দিকও তুলে ধরা হয়। দলটির মতে, তাদের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা, যা সরকারের বাজেটের তুলনায় ছোট এবং তুলনামূলকভাবে কম ঘাটতিনির্ভর। তাদের বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা, যা জিডিপির প্রায় ২ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
গোলাম পরওয়ার বলেন, অর্থবছরের সময়সীমা জুলাই-জুনের পরিবর্তে জানুয়ারি-ডিসেম্বর করার প্রস্তাব দিয়েছে জামায়াত। তাঁর মতে, বর্তমান অর্থবছর কাঠামোর কারণে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে তাড়াহুড়ো হয় এবং কাজের মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি হয়।
করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে তিনি বলেন, জামায়াত এ সীমা ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং পরবর্তীতে ৫ লাখ টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব দিয়েছে।
ব্যাংকিং খাত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। তিনি অভিযোগ করেন, ব্যাংক রেজোলিউশন আইন, অর্থ পাচার এবং ব্যাংকিং খাতে বিভিন্ন অনিয়ম দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা কাঠামো পরিবর্তন এবং ব্যাংকের শীর্ষ পদে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়ার প্রবণতা গ্রহণযোগ্য নয়। যাদের শেয়ার অন্যায়ভাবে কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তাদের শেয়ার আগের মূল্যে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিও জানান তিনি।
বক্তব্যের শেষদিকে সরকারকে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বাতিল, বাজেটে সংশোধনী আনা এবং সংসদে অর্থবহ আলোচনা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান গোলাম পরওয়ার। তাঁর দাবি, জনগণের মতামত ও গঠনমূলক প্রস্তাব বিবেচনায় নিয়ে বাজেটকে আরও বিনিয়োগবান্ধব, কর্মসংস্থানমুখী এবং জনকল্যাণধর্মী করা উচিত। অন্যথায় অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে আরও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম ও ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগর উত্তরের সেক্রেটারি ড. রেজাউল করিম, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য মু. আতাউর রহমান সরকার এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সহকারী প্রচার সম্পাদক আব্দুস সাত্তার সুমন। সূত্র: ঢাকা পোস্ট
দৈনিক সরোবর/ এ এইচ
