মামলাজটে স্থবির শিক্ষা প্রশাসন, আটকে আছে লক্ষাধিক শিক্ষক-কর্মচারীর ভবিষ্যৎ
প্রকাশিত: জুন ২১, ২০২৬, ০৮:৪০ সকাল
স্টাফ রিপোর্টার:
দেশের বিচার ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে চলমান মামলাজট এখন শিক্ষা প্রশাসনের জন্য বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। উচ্চ আদালতে বছরের পর বছর ধরে বিচারাধীন থাকা হাজার হাজার মামলার কারণে শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। এর ফলে শুধু শিক্ষা মন্ত্রণালয় নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক-কর্মচারী এবং শিক্ষার্থীরাও।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এর আওতাধীন দপ্তরগুলোর বিরুদ্ধে বর্তমানে প্রায় ১৩ হাজার ৫৯২টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে ৮ হাজার ৫৫৮টি, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগে ১ হাজার ১২০টি এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ৩ হাজার ৯১৪টি মামলা রয়েছে। এসব মামলার সঙ্গে সরাসরি জড়িত রয়েছেন এক লাখেরও বেশি শিক্ষক ও কর্মচারী। নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ, চাকরি জাতীয়করণসহ নানা বিষয়ে এসব মামলা বছরের পর বছর ধরে আদালতে ঝুলে আছে।
সবচেয়ে আলোচিত মামলাগুলোর মধ্যে রয়েছে ২০১৩ সালে জাতীয়করণ হওয়া বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের চাকরিকাল গণনা ও জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ-সংক্রান্ত মামলা। শিক্ষকদের দাবি, জাতীয়করণের আগে তাদের চাকরিকালের ৫০ শতাংশ গণনা করে গ্রেডেশন তালিকা প্রস্তুত করতে হবে এবং সেই অনুযায়ী পদোন্নতি ও আর্থিক সুবিধা দিতে হবে। এ বিষয়ে ২০১৭ সালে প্রথম রিট দায়ের হয়। পরবর্তীতে আরও কয়েকটি রিট হয় এবং হাইকোর্ট রায় প্রদান করেন। পরে বিষয়টি আপিল বিভাগে গড়ায়। সিভিল আপিল নং-৭৩/২০২৩ মামলার শুনানি গত ১৮ জুন শেষ হয়েছে এবং আগামী ২ জুলাই রায়ের দিন নির্ধারণ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের মতে, এই একটিমাত্র মামলার সঙ্গে প্রায় ৩২ হাজার ৫০০ শিক্ষকের পদোন্নতির বিষয় জড়িত রয়েছে। বর্তমানে সারা দেশে প্রায় ৩২ হাজার ৫০০ প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। আপিল বিভাগের রায় ঘোষণার পর এসব শূন্য পদে পদোন্নতি ও নিয়োগের পথ উন্মুক্ত হতে পারে। ফলে দীর্ঘদিনের একটি বড় প্রশাসনিক জটিলতার অবসান ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে ২০১৯ সালে দায়ের হওয়া একটি রিট মামলার কারণে সারা দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে দপ্তরি কাম প্রহরী পদে নিয়োগ কার্যক্রমও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। রিট নম্বর ১২৭৫০/২০১৯-এর পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত করে রুল জারি করেন। সেই থেকে মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে।
এছাড়া জাতীয়করণকৃত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির জন্য জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের বিধান চ্যালেঞ্জ করে ২০১৫ সালে একটি রিট দায়ের করা হয়। ২০১৯ সালে হাইকোর্ট এ বিষয়ে রায় দেন। পরে আপিল বিভাগে সিভিল আপিল নং-১৩২৬/২০২০ দায়ের করা হয়, যা এখনও শুনানির পর্যায়ে রয়েছে। এই মামলার কারণে প্রায় ২ হাজার ৬০০ শূন্য প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি কার্যক্রম আটকে আছে।
শুধু তাই নয়, বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)-এর প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগ কার্যক্রমও আদালতের নির্দেশনার কারণে স্থগিত রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আপিল নিষ্পত্তি হলে ১০ হাজারেরও বেশি প্রতিষ্ঠানে প্রধান নিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে উত্থাপিত এক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, “বিভিন্ন মামলা জটিলতার কারণে আমরা শিক্ষক নিয়োগ সমস্যার সমাধান করতে পারছি না। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই আদালতপাড়ায় এসব মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা করছি। কিন্তু অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলা এখনও আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় আসছে না। ফলে শিক্ষক সংকট নিরসন করা সম্ভব হচ্ছে না।”
তিনি আরও বলেন, “শুধু জাতীয়করণকৃত বিদ্যালয়ের শিক্ষক পদোন্নতির মামলাই নয়, এনটিআরসিএর প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগ, কলেজের অধ্যক্ষ নিয়োগ, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরি কাম প্রহরী নিয়োগসহ অসংখ্য বিষয় মামলা জটিলতায় আটকে আছে। অন্যদিকে সারা দেশে বর্তমানে ৫০ হাজার ৯৫৭টি শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে।”
আইনজীবীদের মতে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোকে অন্তত ১০ থেকে ১২টি শ্রেণিতে ভাগ করা সম্ভব। এর মধ্যে রয়েছে—বেসরকারি বিদ্যালয় জাতীয়করণ, সহকারী শিক্ষক ও পঞ্চম শিক্ষক জাতীয়করণ, প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত শিক্ষকদের চাকরি জাতীয়করণ, বদলির আদেশ চ্যালেঞ্জ, দপ্তরি কাম প্রহরী নিয়োগ, জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি চ্যালেঞ্জ, প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষকদের চাকরি নিয়মিতকরণ, কোটা ব্যবস্থা সংক্রান্ত বিরোধ, নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল এবং আদালত অবমাননার আবেদনসহ বিভিন্ন ধরনের মামলা।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষে নিযুক্ত আইনজীবী ব্যারিস্টার মুনতাসির উদ্দিন আহমেদ বলেন, “একই ধরনের মামলাগুলো একত্রে শুনানি করা গেলে দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব। এজন্য হাইকোর্টে শিক্ষা-সংক্রান্ত মামলার জন্য একটি ডেডিকেটেড বা সুনির্দিষ্ট এখতিয়ারসম্পন্ন বেঞ্চ গঠন প্রয়োজন। প্রধান বিচারপতির উদ্যোগে এমন বেঞ্চ গঠন করা হলে মামলাজট উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।”
অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ছিদ্দিকউল্ল্যাহ মিয়া মনে করেন, অধিকাংশ মামলার পেছনে রয়েছে প্রশাসনিক উদাসীনতা ও ছোটখাটো বিরোধ। তিনি বলেন, “অনেক কর্মকর্তা নিজেরা সিদ্ধান্ত নিতে চান না। তারা ভুক্তভোগীদের আদালতের দিকে ঠেলে দেন। ছোট ছোট বিষয় সংশ্লিষ্ট দপ্তরেই সমাধান করা গেলে হাজার হাজার মামলা আদালতে যেত না। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ও অতিগুরুত্বপূর্ণ মামলা আলাদা করে দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে হবে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষা প্রশাসনের স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরিয়ে আনতে হলে আদালত ও সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। শিক্ষা-সংক্রান্ত মামলাগুলোকে ক্যাটাগরিভিত্তিক তালিকাভুক্ত করে দ্রুত শুনানি, ডেডিকেটেড বেঞ্চ গঠন এবং প্রশাসনিক পর্যায়ে বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা গেলে দীর্ঘদিনের এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব হবে। অন্যথায় শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি ও শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন কার্যক্রম আরও দীর্ঘ সময়ের জন্য অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে থাকবে।
